,

ফেনীর নুসরাত হত্যায় সব আসামীর ফাঁসি

ফেনী সংবাদদাতা: দেশজুড়ে আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাহসহ ১৬ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৮ মিনিটে এই রায় পড়ে ঘোষণা করেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। মামলার কার্যক্রম শুরুর ৬১ কার্যদিবসের মধ্যে এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায় পড়ার শুরুতেই নুসরাত জাহান হত্যা মামলায় গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে বিচারক বলেন, মিডিয়ার কারণেই এই ভয়াবহ হত্যাকা-ের ঘটনা দেশবাসী জানতে পেরে সোচ্ছার হয়েছে।
প্রত্যাশিত এই রায়ের তারিখ পুর্বনির্ধরিত থাকায় রায় ঘোষণার পূর্বেই আদালত পাড়া লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। এসময় দেশি বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, এনজিও কর্মকর্তা, স্থানীয় সংবাদকর্মী, জেলার আশপাশের বিভিন্ন জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উৎসুক জনতা আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন। এ রায়কে কেন্দ্র করে গতকাল রাত থেকে ফেনী কারাগার ও শহরে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থ করা হয়েছিল। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশি প্রহরা জোরদার করা হয়।
এদিকে রায় শোনেই আসামিরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন। অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করবেন বলে আসামীরা চিৎকার করে বলতে থাকেন। এসময় আসামিরা বাদীপক্ষের আইনজীবী ও সাংবাদিকদের অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেন। পরে পুলিশ পাহারায় আইনজীবীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর আদালতে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। আসামীপক্ষের স্বজনদের কান্নায় আদালতপাড়া সরগরম হয়ে যায়। তারা আসামীদের নির্দোষ দাবী করে হাইকোর্টে আপিল করবেন বলে জানান। মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হলেন- মাদাসার সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌল্লাহ, সোনাগাজী উপজেলা আ’লীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন, পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আ’লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, মাদ্রাসা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, , সাইফুর রহমান, মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, ও মহিউদ্দিন শাকিল। আদালতে সদ্য জন্ম দেয়া কন্যা শিশুটিকে নিয়ে হাজির হন মনি। রায় ঘোষণার পর তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ হত্যার সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই বলেও চিৎকার করতে থাকেন। নুসরাত হত্যায় পেটে ৪ মাসের সন্তান নিয়ে কিলিং মিশনে অংশ নেন মনি। রায়ে অন্যান্য আসামীদের সাথে আদালত মনিরও ফাঁসির আদেশ দেন।
এ মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নুসরাতের পক্ষের প্রধান আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, আদালত আলোচিত এ হত্যা মামলায় যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। এ রায় দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জাানিয়ে নুসরাতের বাবা বলেন, আজ আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি। আমার মেয়েকে ফিরে পাবো না সত্যি। কিন্তু রায়ের ফলে অপরাধী সাজা পেলে আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। তাদের মুত্যুদন্ড কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ করতে আর কেউ সাহস পাবে না। নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে, দ্রুত যেন রায় বাস্তবায়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেবার জন্য আবারও তার সাথে সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ্য চলতি বছরের ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলা দায়ের করে নুসরাত। এ ঘটনায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ফেনীর কারাগারে প্রেরণ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সিরাজ তার কয়েক ছাত্রকে নুসরাত হত্যার নির্দেশ দেয়। স্থানীয় আ’লীগ সভাপতি রুহুল আমিন ও কাউন্সিলর মাকসুদের পরামর্শে গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালীন মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে আসামীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে নুসরাতের সারা শরীর আগুনে দগ্ধ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে নেয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে প্রেরণ করা হয়।
এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ১০ এপ্রিল রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত জাহান রাফি। নুসরাত হত্যা মামলায় পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ২১ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে। পরে ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই।
৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। ২৭ ও ৩০ জুন মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়। এরপর ৯২ সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন সাক্ষ্য দেন আদালতে।সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত রায়ের জন্য এ দিনটি ধার্য করেন।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


সংবাদ পড়তে লাইক দিন ফেসবুক পেজে
shares